নিষিদ্ধ জামাত-শিবির: অতীত ও বর্তমান

প্রকাশ : 03 Aug 2024
নিষিদ্ধ জামাত-শিবির: অতীত ও বর্তমান

স্টাফ রিপোর্টার: সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮-এর ১ ধারা অনুযায়ী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রেরিত এক নির্বাহী আদেশে বুধবার (৩১ জুলাই ২০২৪) মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই আদেশে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ জামায়াতের অন্যান্য অঙ্গসংগঠনকেও নিষিদ্ধ করা হয়।


প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘‌আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত কয়েকটি মামলার রায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (পূর্বনাম জামায়াত-ই-ইসলামী/জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ) এবং তাদের অঙ্গ সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে (পূর্বনাম ইসলামী ছাত্রসংঘ) ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দায়ী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রদত্ত/প্রাপ্ত নিবন্ধন বাতিল করেছে এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের ওই রায় বহাল রেখেছেন।’


প্রজ্ঞাপনে আরো বলা হয়, ‘‌সরকারের কাছে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ আছে যে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির সাম্প্রতিক কালে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ, ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সরাসরি এবং উসকানির মাধ্যমে জড়িত ছিল। সরকার বিশ্বাস করে, জামায়াত ও ছাত্রশিবিরসহ এর সব অঙ্গসংগঠন সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত। এ কারণে সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ধারা ১৮ (১)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরসহ তাদের সব অঙ্গসংগঠনকে রাজনৈতিক দল ও সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করছে। ওই আইনের তফসিল-২-এ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ এর সব অঙ্গসংগঠনকে নিষিদ্ধ সত্তা হিসেবে তালিকাভুক্ত করল। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।’

২০০৮ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার জরুরি অবস্থার মধ্যে একটি অধ্যাদেশ জারি করে, যা ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’ হিসেবে সংসদে পাস করে।

গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার দশটি জঙ্গি দলকে নিষিদ্ধ করলেও ‘সন্ত্রাস বিরোধী আইন’ প্রয়োগ করে কোনো রাজনৈতিক দলকে এবারই প্রথম নিষিদ্ধ করলো।

সংবিধানের সঙ্গে গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক হওয়ায় ২০১৩ সালে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্ট। পরে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে দলটি।


 আর রাজনৈতিক দল হিসেবে ২০১৮ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

২০২৩ সালের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নিবন্ধন অবৈধ বলে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে দলটির আপিল আবেদন খারিজ করে দেয়। এর ফলে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ই বহাল থাকে।

তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে নির্বাহী আদেশে জামাতকে নিষিদ্ধ করার সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, এটি কোনো স্থায়ী বিষয় নয়। পরবর্তী যে কোনো সময়ে অন্য কোনো সরকার ক্ষমতায় এলে এটা উইথড্রও করতে পারে।



জন্মলগ্ন থেকে জামাতের বর্তমান রাজনীতি:


জামায়াতে ইসলামী হিন্দ নামে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়েছিলো সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদীর নের্ত্ ত্বে ব্রিটিশ আমলে ১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট। দেশভাগের আগ পর্যন্ত এই সংগঠনটি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলো।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালে ইসলামি সংবিধানের দাবিতে প্রচারণা শুরু করলে তৎকালীন সরকার জননিরাপত্তা আইনে মওদুদীকে গ্রেফতার করে। একই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানেও জামায়াতের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল নিযুক্ত হয় গোলাম আজম।

১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেয় জামায়াতে ইসলাম। মুসলিম পারিবারিক আইন নিয়ে তুমুল সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতা তৈরির ফলে ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে জামায়াত আবার নিষিদ্ধ হয়। মওদুদী ও গোলাম আজমসহ অনেককে আটক করা হয়। সে বছরের শেষ দিকে দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন জামায়াত অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করতে রাজাকার, আলবদর, আলশামস্ নামে বিভিন্ন দল গঠন করে জামায়াত ও এর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ, যার নাম এখন ইসলামী ছাত্র শিবির। এই দলটির নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডসহ যুদ্ধকালীন গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিলো।


১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে মহান স্বাধীনতা অর্জনের পর স্বাধীন দেশে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক অস্তিত্ব দৃশ্যত বিলীন হয়ে যায়।


১৯৭২ সালে লন্ডনে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তান উদ্ধার কমিটি গঠন করেছিল গোলাম আজম।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা ও গণহত্যায় সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালে গোলাম আজমসহ ৩৮ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করে।

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে জামাতের রাজনীতি করার পথ সুগম হয়। ১৯৭৬ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলে জামায়াতে ইসলামী পুনরায় রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। জামায়াত এসময়ে আরো কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দলের সাথে মিলে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আই.ডি.এল) নামক রাজনৈতিক প্লাটফর্মের জন্ম দেয়।

১৯৭৬ সালে করা নাগরিকত্বের আবেদন খারিজ হলে ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে গোলাম আজম ঢাকায় আসে। জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সরাসরি রাজনীতি করার সুযোগ পেয়ে ১৯৭৯ সালে জামায়াত ইসলামী আইডিএল-এর ব্যানারে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

১৯৮০ সালে ঢাকায় এক সম্মেলনের মাধ্যমে ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ গঠিত হয়। সেই সম্মেলনে গোলাম আজমকে গোপনে আমির করে প্রকাশ্যে আব্বাস আলী খানকে ভারপ্রাপ্ত আমির ঘোষণা করা হয়।

১৯৮১ সালে ঢাকায় বায়তুল মোকাররমের সামনে জামায়াতের প্রথম প্রকাশ্য সভা অনুষ্ঠিত হয়। তারপর থেকে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে দলটি এবং নব্বইয়ের দশকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী কায়দায় সংগঠন গড়ে তোলে ইসলামী ছাত্র শিবির।


জিয়া হত্যার পর স্বৈরাচার এরশাদের সাথে হাত মেলায় জামায়াত ইসলাম। ক্যাম্পাসগুলোকে নিয়মিতভাবে অস্থিতিশীল করে তোলে ছাত্র শিবির। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ফলে একের পর এক ক্যাম্পাসে ছাত্র হত্যা সংঘটিত হয়। স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ১৮টি আসন জিতে তারা বিএনপিকে সরকার গঠনে সমর্থন করে ।

৯০ পরবর্তী সময়কালে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত গণআদালতের রায়ে যুদ্ধাপরাধের দায়ে গোলাম আজমের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়।

বিএনপির শাসনামলে ১৯৯৪ সালে আদালতের রায়ে গোলাম আজম নাগরিকত্ব ফিরে পায়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সাথে একত্রে আন্দোলন করে জামায়াত। ৯৬ এর নির্বাচনে ২টি আসন পায় তারা।


১৯৯৯ সালে বিএনপির সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে চারদলীয় জোট গঠন করে জামায়াত।

গোলাম আজম ২০০০ সালে বিদায় নিলে মতিউর রহমান নিজামী জামায়াতের আমীর হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির সাথে মিলে চারদলীয় জোটের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জামায়াত। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে নির্বাচিত জোট সরকারের মন্ত্রিত্ব পায় জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ।

২০০৮ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় আওয়ামী লীগ। দুটি আসন পায় জামায়াত। এরপর তারা আর কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের লক্ষ্যে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ পুরোনো হাইকোর্ট ভবনে স্থাপন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। মামলার সংখ্যা বাড়ায় এবং বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ২০১২ সালের ২২ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ নামে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গত ১৪ বছরে ৫৫টি মামলার রায় হয়েছে। এসব মামলায় মোট ১৮৮ যুদ্ধাপরাধীর মধ্যে সাজা হয় ১৫৫ জনের। এর মধ্যে ১০৬ জনের মৃত্যুদণ্ড, ২৫ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড, ১২ জনের যাবজ্জীবন এবং বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়েছে ১২ জনের। এর মধ্যে ৬২ জন পলাতক।

ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে শীর্ষ পর্যায়ের সাত আসামির দণ্ড কার্যকর হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে এবং আমৃত্যু কারাদণ্ড ভোগ করা অবস্থায় মারা যান জামায়াত নেতা গোলাম আজম এবং দেলোওয়ার হোসাইন সাঈদী। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ছয় আসামির মধ্যে পাঁচজনই জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও মীর কাসেম আলী ।  


সম্পর্কিত খবর

;